পৌষের হাড়কাঁপানো শীতে যখন রাত নামলেই কেরানীগঞ্জের ঘাট, রাস্তা আর ফুটপাতে শীত যেন আরও নির্মম হয়ে ওঠে, তখন খোলা আকাশের নিচে থাকা অসহায় মানুষগুলোর রাত কাটে নির্ঘুম আতঙ্কে। কারও গায়ে ছেঁড়া চাদর, কারও শরীর কাঁপে ঠান্ডায়—এমন এক কঠিন সময়ে মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন।
সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) রাত। শহরের মানুষ যখন উষ্ণ ঘরে ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা গাড়ি নিয়ে ছুটে চলেছেন এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে, এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায়। কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. উমর ফারুকের নির্দেশনায় রাত ৮টা থেকে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই মানবিক কার্যক্রম।
আব্দুল্লাহপুর, হাসনাবাদ, ইকুরিয়া, আগানগর ঘাট, খোলামোরা ঘাট, আটি বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দুই শতাধিক ছিন্নমূল ও শীতার্ত মানুষের হাতে সরকারি ত্রাণের কম্বল তুলে দেওয়া হয়। নদীর পাড়ে, ঘাটের ধারে, বাসস্ট্যান্ড ও বাজার এলাকায় কাঁপতে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ প্রশাসনের লোকজনকে দেখে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম সরেজমিনে পরিচালনা করেন কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল-দক্ষিণের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফতাব আহমেদ এবং উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাতুল মাওয়া। সঙ্গে ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও প্রশাসনের অন্যান্য কর্মচারীরা।
কম্বল হাতে পেয়ে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। কেউ চোখ ভিজিয়ে দোয়া করেছেন, কেউ কাঁপা কণ্ঠে বলেছেন, আজ রাতে আর ঠান্ডায় মরতে হবে না।গভীর রাতে এমন সহায়তা যেন তাদের কাছে শুধু একটি কম্বল নয়, বরং বেঁচে থাকার সাহস হয়ে ধরা দিয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. উমর ফারুক বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা চেষ্টা করছি প্রকৃত অসহায় মানুষের কাছে সরাসরি শীতবস্ত্র পৌঁছে দিতে। ছিন্নমূল মানুষের পাশাপাশি জেলে, বেদে সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর মাঝেও এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে চারশত কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। শীত যতদিন থাকবে, ততদিন এই মানবিক কার্যক্রম চলমান থাকবে।
তিনি আরও বলেন, শীতের এই কঠিন সময়ে কেউ যেন অবহেলায় কষ্ট না পায়—এটাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, শীতের গভীর রাতে মাঠে নেমে প্রশাসনের এমন উদ্যোগ শুধু দায়িত্ব পালন নয়, এটি মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তারা বলেন, এই সহানুভূতিশীল উদ্যোগ অসহায় মানুষের মাঝে প্রশাসনের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা বাড়িয়ে দিয়েছে।
পৌষের জমাট বাঁধা এই শীতে কেরানীগঞ্জের রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে থাকা অসহায় মানুষের গায়ে যখন প্রশাসনের দেওয়া কম্বল জড়াল, তখন শীতের রাতে কিছুটা হলেও উষ্ণ হলো মানবতার আলো।