• ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Daily Jonokotha

ক্যাপাসিটি চার্জের অর্থ ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ হোক: বিদ্যুৎ খাতে নতুন চিন্তার সময় এসেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত আগস্ট ৪, ২০২৬, ১৮:০৭ অপরাহ্ণ
ক্যাপাসিটি চার্জের অর্থ ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ হোক: বিদ্যুৎ খাতে নতুন চিন্তার সময় এসেছে [ppsp_buttons]

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাস মূলত দুটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায় ছিল বিদ্যুতের ঘাটতির, দ্বিতীয় অধ্যায় উদ্বৃত্ত উৎপাদন সক্ষমতার। একসময় বিদ্যুৎ না থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা; আজ অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেই সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও বিভিন্ন কেন্দ্রকে চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এই অর্থের বড় অংশই আসে জনগণের করের টাকা ও বিদ্যুতের বিল থেকে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (আমদানি ও অফ-গ্রিডসহ) ৩২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬,৮০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সক্ষমতা সবসময় অব্যবহৃত থাকে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—যে অর্থ অলস উৎপাদন সক্ষমতার জন্য ব্যয় হচ্ছে, তার অন্তত একটি অংশ কি এমন খাতে বিনিয়োগ করা যায় না, যা ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ ব্যয় কমাবে এবং জনগণকে সম্পদশালী করবে?

আমার প্রস্তাব হলো—ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয়ের একটি অংশ দিয়ে একটি “জাতীয় রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ তহবিল” গঠন করা হোক।

এই তহবিল থেকে সাধারণ পরিবার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হবে। সেই অর্থে তারা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ আগে নিজেরা ব্যবহার করবে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে। গ্রিডে বিক্রি হওয়া বিদ্যুতের মূল্য থেকেই ঋণের কিস্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হবে। ঋণ শেষ হলে পুরো আয় ভোক্তার হাতে যাবে।

এটি নতুন কোনো ধারণা নয়; বিশ্বের বহু দেশ এ ধরনের নীতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে।

জার্মানি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা দিয়ে লাখো পরিবারকে বিদ্যুৎ উৎপাদকে পরিণত করেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ৪০ লক্ষেরও বেশি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং প্রায় ৪৪ শতাংশ স্বতন্ত্র বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ভিয়েতনাম অতিরিক্ত রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে কেনার নীতি গ্রহণ করে খুব অল্প সময়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করেছে।

ভারত, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাষ্ট্রের বহু অঙ্গরাজ্যেও নেট মিটারিং নীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশীদার করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) বলছে, বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ, সহজ অর্থায়ন এবং কার্যকর নেট মিটারিং একসঙ্গে থাকলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ে, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজন কমে এবং গ্রিড আরও স্থিতিশীল হয়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সর্বোচ্চ চাহিদার সময় (Peak Demand) গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশেও ইতোমধ্যে নেট মিটারিং নীতিমালা কার্যকর রয়েছে এবং ২০২৫ সালের হালনাগাদ নির্দেশিকায় এ ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইতোমধ্যে হাজার হাজার নেট-মিটারিং সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং মোট সংযুক্ত ক্ষমতা প্রায় ১৮৫ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। তবে দেশের সম্ভাবনার তুলনায় এটি এখনও খুবই সামান্য।

ধরা যাক, আগামী ১০ বছরে ১০ লাখ পরিবারের ছাদে গড়ে ৫ কিলোওয়াট করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেল। তাহলে প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি হবে। এর বড় অংশ দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের চাহিদা কমাতে ব্যবহার করা যাবে। ফলে আমদানিকৃত জ্বালানির প্রয়োজন কমবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং নতুন কেন্দ্র নির্মাণের চাপও হ্রাস পাবে।

তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু সতর্কতাও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, নেট মিটারিংয়ের আর্থিক কাঠামো এমন হতে হবে যাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা উৎসাহ পান, আবার গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থার আর্থিক ভারসাম্যও নষ্ট না হয়। তাই নীতি প্রণয়নের সময় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, স্মার্ট মিটার, গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং ন্যায্য মূল্য নির্ধারণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আজ ক্যাপাসিটি চার্জের অর্থ মূলত একটি চলতি ব্যয়। কিন্তু একই অর্থ যদি জনগণের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগ করা যায়, তবে সেটি হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সম্পদ। এতে সরকার, বিদ্যুৎ খাত এবং সাধারণ মানুষ—তিন পক্ষই লাভবান হবে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ক্যাপাসিটি চার্জের অর্থকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করা হতে পারে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

সময় এসেছে প্রতিটি ছাদকে একটি ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত করার। আজকের ক্যাপাসিটি চার্জ যদি আগামী দিনের সৌরবিদ্যুৎ বিনিয়োগে রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশ শুধু বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।